গানবাজনা

সোলস ইজ গোল্ড

September 10, 2018
ফেসবুকে শেয়ার করুন

স্বাধীনতার ঠিক পরের বছর, ১৯৭২ সাল। দেশ তখন সবদিক দিয়েই অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, শিল্প-সাহিত্য-সংগীতে­ও অচলাবস্থা। সেসময় চট্টগ্রামের কয়েকজন গানপাগল তরুণ সাজিদ, জিলু, নেওয়াজ, রনি বড়ুয়া ও তাজুল মিলে গানের দল গঠন করে যাবতীয় অচলাবস্থাকে পাশ কাটাতে চাইলেন। তখনকার সনাতনীয় প্রথাগত মিউজিকের বাইরে গিয়ে বিদেশী ব্যান্ডগুলোর অনুপ্রেরণায় ‘ওয়েস্টার্ন রক’ চর্চার এবং রক-এর সাথে দেশের তরুণদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার তাগিদ থেকেই তারা অগ্রসর হচ্ছিলেন।

স্বাভাবিকভাবে তাদের এই কাজে অগ্রসর হওয়া সহজসাধ্য ছিলো না। বাংলা গান তখন সীমাবদ্ধ ছিলো শাস্ত্রীয়-ফোক, রবীন্দ্র-নজরুল, বাউল-লোকগান-আধুনিক মেলোডিয়াস গানের মধ্যে। শুধুমাত্র মনোবলকে পুঁজি করে নতুন কিছু করার স্পৃহা থেকেই চট্টগ্রামে ১৯৭২ সালে প্রাথমিকভাবে ‘সুরেলা’ নামে তারা ব্যান্ডযাত্রা শুরু করেন। তখনকার দিনে বড় বড় ক্লাব-হোটেলে ছাড়া কোথাও গানবাজনা হতো না। আর সেইসব জায়গাতে শুধুমাত্র ইংরেজি গানের কাভার করা হতো, বাংলা গান ছিলো ব্রাত্য। তাই ব্যান্ডগুলোর নামও ইংরেজিতে রাখার চল শুরু হয়েছিলো। এসবকে বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭৩ সালে ব্যান্ডের নাম পাল্টে ‘সোলস’ রাখা হলো, বাংলার যার অর্থ হয় ‘আত্মার সমন্বয়ে’।

১৯৭২ সালের শেষদিকে লুলু ব্যান্ড ত্যাগ করায় নকীব খান ব্যান্ডে যোগ দিয়েছিলেন। তারপর নকীবের ছোটো ভাই পিলু খানও ব্যান্ডে যোগ দেন। কিছুদিন পর তপন চৌধুরী সোলসে নাম লেখান। তখনও সোলসের তৎপরতা শুধুমাত্র চট্টগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। প্রথম প্রথম শুধু ইংরেজি গান কাভার করলেও তারা একটা সময় নিজেদের গান করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম গানটি কম্পোজ করেছিলেন নকীব খান। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে পপ মিউজিকের একটি প্রতিযোগিতায় নাম লেখায় ‘সোলস’, জিতেও নিয়েছিলো সেরার পুরস্কার। মূলত সেই থেকেই শুরু হয়েছিলো সোলসের জয়যাত্রা। ১৯৭৭ সালে ব্যান্ড যোগ দিলেন নাসিম আলী খান। কুমার বিশ্বজিৎ এবং গিটারম্যান আইয়ুব বাচ্চু সেসময় ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডে ছিলেন। ১৯৮২ সালে সোলসে যোগ দেয় এবি। আইয়ুব বাচ্চুকে ব্যান্ডের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন পিলু খান। এবি শুরুতে ছিলেন একাধারে গিটারিস্ট-ভোকালিস্ট-­লিরিসিস্ট-কম্পোজার। আশির দশককে সোলসের স্বর্ণযুগ বলা হয় কারণ সেসময়ে তাদের ব্যান্ড লাইনআপ ছিলো দুর্দান্ত।

নকীব খান, পিলু খান, তপন চৌধুরী, নাসিম আলী খান, আইয়ুব বাচ্চু ,রনি বড়ুয়া, নেওয়াজ, সাজেদ।

নামগুলো পড়লেই তাদের সেসময়ের লাইনআপ সম্পর্কে বুঝতে পারার কথা। এছাড়া বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বেইজিস্ট তানিমও কিছুকাল সোলসে বাজিয়েছেন।

( * সংযুক্তিঃ অনেকেই কুমার বিশ্বজিৎ সোলসের সদস্য ছিলেন বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে তিনি কখনোই সোলসের মেম্বার ছিলেন না। উনি ফিলিংসে ছিলেন, এরপর সবসময়ই সলো ক্যারিয়ার করেন। উনি সোলসের একটা গান বন্ধুত্বের খাতিরে সোলস রিলিজ করার আগেই টিভিতে গেয়ে ফেলেন এবং খ্যাতি পান । গানটার নাম ‘তোরে পুতুলের মত করে’। পরে এটা সোলসের এ্যালবামে জায়গা পেলেও কুমার বিশ্বজিতের নামেই পরিচিত হয় )

 

Souls-Tapan-choudhury-1

আশির দশকে সোলস। ছবি – bangla.bdnews24.com

ডিস্কোগ্রাফিঃ

  • ১৯৮০ সালে বের হয় সোলসের ১ম অ্যালবাম ‘সুপার সোলস’। এটিই ছিলো বাংলাদেশের কোনো ব্যান্ডের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম, প্রথম রক অ্যালবাম। সেই অ্যালবামের ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’, ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’, ‘এই মুখরিত জীবন’ গানগুলো অল-টাইম হিটস।
  • সোলসের ২য় এ্যালবাম ‘কলেজের করিডোরে’ বের হয় ১৯৮২ সালে। এ্যালবামের ‘কলেজের করিডোরে’, ‘ফরেস্ট হিলের এক দুপুরে’, ‘ফুটবল ফুটবল’ গানগুলো তখন বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো বলে জানা যায়। এই এ্যালবাম করার পরেই নকীব খান ও পিলু খান ব্যান্ড ছেড়ে দিয়ে পরবর্তীতে ‘রেনেসাঁ’ গঠন করেন।
  • ১৯৮৭ সালে ‘মানুষ মাটির কাছাকাছি’ নামে ব্যান্ডের ৩য় এ্যালবাম বের হয়। এই এ্যালবামেই আইয়ুব বাচ্চু প্রথম কোনো গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন। গানের শিরোনাম ছিলো ‘হারানো বিকেলের গল্প বলি’
  • ‘ইষ্ট এন্ড ওয়েস্ট’ নামে সোলস তাদের ৪র্থ এ্যালবাম বের করে ১৯৮৮ সালে। ৬ টি বাংলা গানের পাশাপাশি ৬ টি ইংরেজি গানও ছিলো এই এ্যালবামে। সেই বছরেই আইয়ুব বাচ্চুর হাত ধরে সোলসে আগমন ঘটে পার্থ বড়ুয়ার, যিনি এখনো সোলসের ভোকালিস্ট হিসেবে আছেন। সোলসে আসার আগে পার্থ বড়ুয়া ছিলেন ‘ম্যাসেজ’ ব্যান্ডের কিবোর্ডিস্ট। পার্থ গিটার শিখেছেন এবির কাছেই। ১৯৮৯ সালে আইয়ুব বাচ্চু ব্যান্ড ত্যাগ করে আরেকটা নতুন ব্যান্ড ‘এলআরবি’ গঠন করেন।
  • কিছুদিন বিরতির পর ১৯৯২ সালে ব্যান্ডের ২০ বছর পূর্তিতে বের হয় তাদের ৫ম স্টুডিও এ্যালবাম ‘এ এমন পরিচয়’। বিগত কয়েক বছর ধরে তপন চৌধুরী একক গান নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তারা খানিকটা অনিয়মত হয়ে পড়েছিলো। এটা ছিলো তপন চৌধুরীর সাথে সোলসের শেষ এ্যালবাম। এরপর তপন চৌধুরী পুরোপুরিভাবে সলো ক্যারিয়ারের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
  • ১৯৯৫ সালে সোলস বের করে তাদের ৬ষ্ঠ এ্যালবাম ‘আজ দিন কাটুক গানে’। এই এ্যালবামের ‘কেন এই নিঃসঙ্গতা’ গানটি সোলসের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান বলা যায়। এই এ্যালবাম দিয়ে পার্থ শ্রোতাদের মন জয় করে নিয়েছিলো।
  • ১৯৯৭ সালে সোলসের ৭ম এ্যালবাম ‘অসময়ের গান’ রিলিজ হয়েছিলো। এ্যালবামের ‘আইওনা আইওনা’ গানটি সেসময় বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলো।
  • একুস্টিক ভার্শনে তাদের আগের কিছু গান, কিছু নতুন গান আর জনপ্রিয় কয়েকটা গানের কাভার মিলে ২০০০ সালে বের হয় সোলসের ৮ম এ্যালবাম ‘মুখরিত জীবন’। এ্যালবামের টাইটেল গানটা এখনও বেশ জনপ্রিয়। টিভি লাইভে এই গানটার অনুরোধ তাদেরকে সবচেয়ে বেশী করতে হয়।
  • ২০০২ সালে বের হয় তাদের নবম এ্যালবাম ‘তারার উঠোনে’
  • দশম এ্যালবাম ‘টু-লেট’ রিলিজ হয় ২০০৫ সালে। তাদের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার মবিন-এর মৃত্যুর পূর্বের শেষ কাজ এই এ্যালবামটি।
  • ২০০৬ সালে বের হয় তাদের ১১তম এ্যালবাম ‘ঝুট ঝামেলা’
  • সোলসের ১২তম এবং সর্বশেষ এ্যালবাম ‘জ্যাম’ বের হয় ২০১২ সালে । এখানে নির্মলেন্দু গুণ নামে একটা গান জনপ্রিয় হয়। তাছাড়া জ্যাম টাইটেল ট্র্যাকটি বাস্তব ইস্যু হওয়াতে খুব আলোচিত হয়।

বিভিন্ন এ্যালবামের প্রচ্ছদ

সোলস মূলত ফিউসনিক রক জনরার গান করে থাকে। মেলোডিয়াস ব্যাপারটা তাদের গানে লক্ষ্যনীয়। বিভিন্ন সময়ে ভোকাল পরিবর্তনেও সোলস-এর মৌলিকত্বের হানি ঘটেনি। জিম মরিসন, জন লেনন, দ্যা বিটলস-সহ তখনকার সমসাময়িক গ্রেটদের দেখেই প্রথমাবস্থায় তারা শুরু করেছিলেন, অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এই ব্যান্ড থেকেই বাংলা সঙ্গীতের অনেক মিউজিসিয়ানের জন্ম। কিছু বছর ধরে বাংলা ব্যান্ডগুলো অবিরাম ভেঙ্গেই চলছে। সেক্ষেত্রে ‘সোলস’ হতে পারে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বারবার প্রতিকূলতা কাটিয়ে কিভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় সেটা সোলস দেখিয়েছে। সোলস সাম্প্রতিক সময়েও অন্যতম ব্যস্ততম ব্যান্ড। গত পাঁচ-সাত বছরে দেশে ও দেশের বাইরে সর্বাধিক স্টেজ শো করা ব্যান্ড তারা। সম্প্রতি ২০১৭ সালে পহেলা বৈশাখে অস্ট্রেলিয়ার নিকোলসের লিউমেহ লজে একটি কনসার্টে ‘সোলস’ পারফর্ম করেছে। ব্যান্ড কখনোই একজনের অবদানে হয় না, তবে ‘সোলস’ বলতে যদি একটি নাম বলতে হয়, সে হচ্ছে নকীব খান । ব্যান্ডের শ্রোতাপ্রিয় অধিকাংশ গানের স্রষ্টা তিনি। সোলস ২০১৭ সালে ছয়টি গান নিয়ে ‘বন্ধু’ নামে নতুন এ্যালবামের ঘোষণা দিয়েছিলো, এক বছর কেটে গেলেও তাদের এ্যালবাম রিলিজ হয়নি। ২০১৮ সালের প্রথমদিকে ‘সুপ্রিয় বাংলাদেশ’ নামে তাদের নতুন একটি গানের মিউজিক ভিডিও প্রকাশ হয়েছে।

একনজরে ‘সোলস’

উৎপত্তিঃ চট্টগ্রাম
প্রতিষ্ঠাঃ ১৯৭২ (১৯৭৩-এ সোলস নামে কার্যক্রম শুরু)

জনরাঃ নির্দিষ্ট কোনো জনরায় সীমাবদ্ধ নয়। রক (ফিউসনিক) বলা যায়।

বর্তমান লাইনআপঃ

নাসিম আলী খান – ভোকাল
পার্থ বড়ুয়া – ভোকাল, গিটার
মাসুম – কী বোর্ড
আশিক – ড্রামস
রিয়েল – বেজ

এ্যালবামঃ

সুপার সোলস (১৯৮০)
কলেজের করিডোরে (১৯৮২)
মানুষ মাটির কাছাকাছি (১৯৮৭)
ইষ্ট এন্ড ওয়েস্ট (১৯৮৮)
এ এমন পরিচয় (১৯৯২)
আজ দিন কাটুক গানে (১৯৯৫)
অসময়ের গান (১৯৯৭)
মুখরিত জীবন (২০০০)
তারার উঠোনে (২০০২)
টু-লেট (২০০৫)
ঝুট ঝামেলা (২০০৬)
জ্যাম (২০১১)

 

( Ishtiak Islam Khan ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কুমার বিশ্বজিৎ সোলসের এক্স মেম্বার ছিলো বলে আমরা এতোদিনে জেনে এসেছি। কিন্তু তিনি যে কখনো সোলসের মেম্বার ছিলেন না এসংক্রান্ত তথ্য তার কাছ থেকে পেয়েছি, যেটা লেখার ভেতরে * চিহ্নিত সংযুক্তি অংশে দেওয়া আছে)

( এই লেখাটি পূর্বে ‘রক রেভোলিউশনে’ প্রকাশিত। কয়েকটি শব্দ যোগ-বাদ দেওয়া হয়েছে)

Facebook Comments
ফেসবুকে শেয়ার করুন

মন্তব্য করুনঃ