চলৎ+চিত্র

রূপান্তর : সাঁওতালী তীরন্দাজদের মেটামরফোসিসের গল্প

September 7, 2018
ফেসবুকে শেয়ার করুন
প্রথমেই মহাভারতের একলব্যের কাহিনী দিয়ে শুরু করি,

পঞ্চপাণ্ডবের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য তার সেরা শিষ্য অর্জুনকে শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন অর্জুনকে কেউ হারাতে সক্ষম নয়। সেই সময়টাতে নিষাদরাজ হিরণ্য-ধনুর সন্তান যুবরাজ একলব্য পরম ভক্তি নিয়ে দ্রোণাচার্যের কাছে তীরচালন শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়েছিলেন। নিষাদরা ছিলো মূলত আদিবাসীদের জোট, তারা প্রকৃতির সন্তান। তখন সমাজে কে কোন দায়িত্ব পালন করবে সেটা তার সম্প্রদায় দিয়ে নির্ধারিত হোতো। যুদ্ধ ক্ষত্রিয়দের কাজ, তাই দ্রোণাচার্য অনার্য একলব্যকে অস্ত্রশিক্ষা দিতে অস্বীকৃতি জানান। নিষাদকুমার একলব্য বিফল হয়ে এক বনে আশ্রয় গ্রহণ করেন। দ্রোণাচার্যকেই তার গুরু মেনে, তাঁর মূর্তি তৈরি করে তিনি অস্ত্রসাধনা শুরু করেন। একসময় তিনি অত্যন্ত দক্ষ হয়ে ওঠেন। অর্জুন একলব্যের এই দক্ষতার পরিচয় পেয়েই গুরুর কাছে আবেদন করেন যে, একলব্যের কারণে তার খ্যাতি হুমকির সম্মুখীন হতে চলেছে। দ্রোণাচার্য তার প্রিয় শিষ্যের মান রক্ষার্থে একলব্যের কাছে ছুটে গেলে দেখতে পান, একলব্য তো তাকেই গুরু হিসেবে ভজন করে এসেছে। অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য দ্রোণ এক ফন্দি বের করেন। তিনি একলব্যের কাছে গুরুদক্ষিণা হিসেবে বৃদ্ধাঙ্গুলি চেয়ে বসেন। একলব্য খুশিমনে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে দেন, অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব জারি থাকে।

আবু সাইয়ীদ তার এই ‘রূপান্তর’ সিনেমাটায় দেখিয়েছেন একজন চলচ্চিত্র পরিচালকের শুটিং-এ থাকা দিনগুলিকে, নির্মান প্রক্রিয়ার মধ্যেও ডিরেক্টরসভিউ কীভাবে পাল্টে যেতে পারে সেটার অনুষঙ্গ এসেছেন। সেই নির্মাতা আরিফ (ফেরদৌস) মহাভারতের অবহেলিত চরিত্র একলব্যের গুরুভক্তি নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছিলেন, পার্বত্য এলাকায় শুটিং চলছিলো। চিত্রধারণের একপর্যায়ে এসে বেশ জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হন তিনি। কারণ শুটিং দেখতে ভীড় করা সাঁওতালী যুবারা বলাবলি করতে শুরু করে যে অভিনেতাতো (একলব্যের চরিত্রের) তীর ধরতেই জানেন না। স্বভাবতই অভিনেতাটি তীর ধরেছিলেন বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে অথচ সেই যুবকদের বক্তব্য ছিলো তারা তীর ধরে মধ্যমা ও তর্জনী দিয়ে। এটা শুনে আরিফ বেশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। সাঁওতালদের মধ্যে বয়স্ক তীরন্দাজের সাথে কথা বলে জানতে পারেন তারা যুগ যুগ ধরে মধ্যমা ও তর্জনী দিয়েই তীর চালিয়ে আসছে। এটা জেনে আরিফ কয়েকদিন চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে চিন্তাভাবনা করতেই থাকে। তার সহকারী পরিচালক শায়লা এই চিন্তাভাবনায় তাকে সাহস যোগাচ্ছিলেন।

কয়েকদিনের চিন্তাভাবনার পর শেষমেশ আরিফ তার চিত্রনাট্যই পাল্টে ফেললেন। চিত্রনাট্যের ডিম্যান্ড অনুযায়ী এবারে অভিনেতা হিসেবে কয়েকজন সাঁওতালকে রাখলেন। তিনি এবার দেখাতে চাইলেন তীরচালনার এই রূপান্তর, নিষাদরাজ থেকে এখনকার সান্তালেরা পর্যন্ত কীভাবে এই অল্টারনেটিভ থিংকিং-এর শুরুটা হয়েছে । একলব্যের অনুসারীরা তাদের প্রিয় কুমারকে সম্মান জানানোর জন্য বৃদ্ধাঙ্গুলি বাদ দিয়ে মধ্যমা ও তর্জনী ব্যবহার করে তীর চালানোর সাধনা-অনুশীলন করতে থাকেন। যদিও প্রথমে একলব্য এতে রাজি ছিলেন না, কারন তীরচালনার এই প্রচলিত রীতির রূপান্তর ঘটানো বেশ কষ্টসাধ্য। তিনি সিনেমার নাম পাল্টে ‘রূপান্তর’ দিয়ে দেন।

সিনেমাটিতে সমাজের বিত্তবানদের ক্ষমতার সাথে পাল্লা দিয়ে নিন্মশ্রেণীর মানুষকে মানসিকভাবে একপ্রকার টিকে থাকার লড়াই ও প্রয়োজনবোধে তাদের রূপান্তরেচ্ছা প্রাধান্য পেয়েছে। আবু সাইয়ীদ হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন বৈভবের শক্তির কাছে ন্যায়-অন্যায় তুচ্ছ। সত্য শুধুই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন, যেখানে দ্রোণের মতো গুরুদেরও মজতে দেখা গেছো।

সিনেমাটিতে যে লোকেশনে ব্যবহার করা হয়েছে সেটা মহাভারতের মতো বিশাল কিছুতে বড্ড বেমানান। এই ধরণের সিনেমা বড় এমাউন্টের বাজেট ডিজার্ভ করে। এক্ষেত্রে পরিচালককে দোষ দেওয়া যাবে কী যাবে না সেটা ভাবার বিষয়!  কিন্তু সিনেমাটি ২০০৭ সালে নেদারল্যান্ডের রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ‘হুবার্ট বল’ ফান্ড থেকে অনুদান পেয়েছিলো, আবার বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকেও অনুদান পেয়েছিলো। এসব বিবেচনায় এই সিনেমাটার বাজেট মোটামুটি স্ট্রং থাকার কথা ছিলো।

ফেরদৌস বাদে এই চরিত্রের জন্য অন্যকাউকেও ভাবা যেতো বলো মনে হয়েছে। তিনি যে খুব খারাপ করেছেন সেটাও বলা যাবে না। আর তার ডাবিংটা ততোটা যুতসই লাগেনি। ‘সিনেমার মধ্যে আরেক সিনেমা’ ব্যাপারটায় প্যারালালি আরো কিছু ঘটনাক্রম আনা যেতো, মাঝপথে খানিকিটা ম্যাড়ম্যাড়েও লেগেছে সিনেমার প্রকাশভঙ্গী, ধীরে চলো নীতিতে গল্প আগাচ্ছিলো তখন। শায়লাকে দেখে মনে হয়নি তিনি একজন সহকারী পরিচালক চরিত্রে ঢুকতে পেরেছেন। গল্পের জোরে এভারেজ লেভেলের সিনেমাটোগ্রাফী মোটামুটি উৎরে গেছে। গোটাটা দেখলে তেমন বিশেষকিছু না হলেও, বাংলা সিনেমা হিসেবে আমার কাছে  এ+ না পেলেও,  এ গ্রেড পেয়েছে।
রুপান্তর ২০০৯ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত ‘ট্রাইবাল শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রে‘র তকমা জিতে নিয়েছিলো।
Facebook Comments
ফেসবুকে শেয়ার করুন

মন্তব্য করুনঃ